শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

যে মরণের জন্য আমার লোভ হয়

১৯৯৯ সালে ৮ অক্টোবর বর্ষীয়ান জননেতা মরহুম আব্বাস আলী খান স্মরণে দৈনিক সংগ্রাম যে বিশেষ সংখ্যা বের করে সে সংখ্যায় শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার এই কলামটি ছাপা হয়।

গত ৬ই অক্টোবর। ভোর সাড়ে সাতটা। বাসায় বেল বাজলো। দরজা খুলে দেখি আমার শিক্ষকতা জীবনের এক প্রিয় ছাত্র শহীদ কোনো একটি কাজে হাজির। বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর একজন কর্মী। বাসা উত্তরার কাছে। কথাবার্তা বলতেই শহীদ মরহুম আব্বাস আলী খানের প্রতি তার ভক্তি শ্রদ্ধার কথা তুললো। তার ভাষায়- ‘জনাব খান আকার আকৃতিতে খুব বড় দেহের লোক ছিলেন না। কিন্তু হাঁটা চলায়, কথা বলার ধরনে, তাঁর চাহনিতে মনে হতো যেনো এক বিশাল ব্যক্তিত্ব। জনসভায় তিনি যে বক্তৃতা দিতেন তা অন্যান্য নেতাদের মতো ছিলো না। ভাষার গাঁথুনি, বলার ভঙ্গি, যেখানে যে শব্দের উপর যতোটা জোর দেয়া দরকার তা দিতেন খুব মজবুতভাবে। স্যার, আসলে খান সাহেবের প্রতি আমার কিযে ভক্তি শ্রদ্ধা এবং মহব্বত ছিলো তা ভাষায় বলতে পারবো না। মনে হয় যদি মরহুম খান সাহেবের জন্য প্রাণভরে চিৎকার করে কাঁদতে পারতাম একেবারে শিশুর মতো গড়াগড়ি দিয়ে তাহলে মনটা একটু হালকা হতো।”

আমার ছাত্রটি জামায়াতের সাথে যুক্ত হয়েছে খুব বেশী দিন নয়। কিন্তু এতো অল্প দিনে খান সাহেবের প্রতি তার শ্রদ্ধা এবং মহব্বতের কথা যেভাবে সহজ সরল ভাষায় অশ্রুসিক্ত চোখে বলে গেলো এটা হুবহু আমার মনেরই কথা। বয়সে আমাদের চেয়ে অনেক বড় এবং ব্যক্তিত্বটি বেশী ভারী হওয়ার কারণে আমরা সাধারণত কেউই তাঁর নাম সচরাচর উচ্চারণ করতাম না। আমীরে জামায়াত থেকে সকলেই বলতাম ‘খান সাহেব’। তাঁর পান্ডিত্য ছিলো সুগভীর। বাংলা ছাড়াও ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় তাঁর দখল ছিলো প্রায় মাতৃভাষার মতো। আরবিতেও তাঁর দখল এতোটা ছিলো যে, একজন আধুনিক শিক্ষিত লোক হওয়ার পরও জুমআর নামাযে খুতবা দেয়ার অনুরোধে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই উঠে পড়তেন মিম্বরে। খুতবা দিতেন একজন যোগ্য আলেমের মতোই। নামাযে ইমামতি করতেন অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় কুরআন মজীদ তেলাওয়াত করে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ওয়াক্তে প্রায়ই নতুন নতুন আয়াত তেলাওয়াত করতেন।

ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় একদিন জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা খান সাহেব আপনি মাদ্রাসায় না পড়েও এতো সূরা বা আয়াত মুখস্থ করলেন কী করে?” তিনি একটু মুচকি হেসে বললেন, “বুঝলেন মোল্লা সাহেব, আমি ছোটবেলা থেকেই গানের পাগল ছিলাম। গান গাইতামও খুব। বিশেষ করে ঘুমন্ত মুসলিম জাতির জন্য কবি নজরুল ইসলামের জাগরণী গানগুলো আমার ছিলো খুব পছন্দ। কিন্তু ফুরফুরার মরহুম পীর আব্দুল হাই সিদ্দিকী সাহেবের মুরিদ হয়ে যখন গানের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম, তখন তিনি তা অপছন্দ করলেন। আমি পীর সাহেবের খেলাফত পেয়েছিলাম। তাই গান ছেড়ে দিয়ে কুরআন সুর দিয়ে পড়া শুরু করলাম। আর মুখস্থ করতে লাগলাম নতুন নতুন সূরা ও আয়াত। যখন সময় পাই, গুণ গুণ করে আমার বেশী পছন্দের আয়াতগুলো আবেগভরে তেলাওয়াত করি। একা একা থাকলে বেশ সুর দিয়েই তা করি। এ জন্যেই বেশ আয়াত মুখস্থ করতে পেরেছি। বয়স হলেও আল্লাহর মেহেরবানিতে আমার স্মরণশক্তিতে ভাটা পড়েনি। এখনও নতুন নতুন আয়াত মুখস্থ করার কোশেশ করি। মনেও থাকে বেশ।”

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম পীর মুরিদি ছাড়লেন কেন? হেসে বললেন একেবারে তো ছাড়িনি। আমি মাওলানা মওদূদীর (র.) মুরিদ। আপনারা আমার মুরিদ। বলেই জামায়াতে আসার ঘটনাটি বললেন। তিনি বললেন, ‘হেডমাস্টারির জীবনে অধ্যাপক গোলাম আযমের কাছ থেকে ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াত পাই। বগুড়ায় গিয়ে জেলা জামায়াত অফিস থেকে কিছু বই সংগ্রহ করে পড়ি আর আকৃষ্ট হই। একদিন ট্রেনে ভ্রমণের সময় আমার পীর সাহেবকে মাওলানা মওদূদী (র.) লিখিত কয়েকটি বই থেকে উর্দুতে কিছু পড়ে শুনাতে থাকি। তিনি মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন উঠেন, “বাবা এটাই তো আসল কাজ। ইক্বামাতে দ্বীনের জন্যই তো আমি আপনাদের তৈরি করছি। এ কাজই যখন আপনার পছন্দ, তখন জান-প্রাণ দিয়ে করেন। এ কাজে কিন্তু ঝুঁকি আছে।” তখন থেকেই জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়ে কাজ শুরু করি।

উর্দু ভাষায়ও তাঁর দখল ছিলো বেশ। মাওলানা মওদূদীর (র.) বেশ কয়েকটি কঠিন বই তিনি তরজমা করেছেন। তাঁর তরজমা যে কোনো আলেমের চেয়ে মোটেই কম সার্থক নয়। বই পড়লেই বুঝা যাবে উর্দু ভাষায় তাঁর দখল কতটা ছিলো। শুনেছি জেলখানায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মরহুম শাহ আজিজুর রহমান একদিন উর্দু ভাষায় আল্লামা ইকবাল, মির্জা গালিবসহ অন্যান্য অনেক কবি ও লেখকের কবিতা বইপত্র নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে মরহুম খান সাহেবকে উস্তাদ হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। উর্দু ভাষায় মরহুম শাহ আজিজের দখল সম্বন্ধে যাদের ধারণা আছে তারা অবশ্যই তাঁর স্বীকৃত উস্তাদের ভাষাজ্ঞান সম্পর্কে সহজেই ধারণা করতে পারবেন।

খান সাহেবের কোনো পুত্রসন্তান ছিলো না। এ জন্যে কোনো সময়ই তাঁকে আফসোস করতে দেখিনি। স্ত্রী অসুস্থ হয়ে বিছানায় ছিলেন দীর্ঘ নয়-দশ বছর। কিন্তু কোনো সময়ই তার জন্য তাঁকে পেরেশান দেখিনি। এমনকি ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় নিজের থেকে কোনো সময়ই এসব কথা তুলতেন না। বরং ইসলামী আন্দোলন, তাক্বওয়া, উত্তম নামায, আল্লাহর ওয়াস্তে যে সব কাজ করা হয় তাতে নিয়তের বিশুদ্ধতা বা এখলাস, দেশের ভবিষ্যৎ, বিশেষ করে বর্তমানে ভারতপন্থী এবং মারদাঙ্গা ও খুনাখুনিতে পারঙ্গম দলটি সরকারি ক্ষমতায় আসায় দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে- এগুলোই ছিলো তাঁর আলোচনার বিষয়। বিগত কয়েক বছর ধরে দেশ নিয়ে তাঁর পেরেশানি এতটাই ছিলো যে, তাঁর প্রতিক্রিয়া তিনি বিভিন্ন বৈঠকেও প্রকাশ করেছেন।

একদিন আমাদেরই নির্বাহী পরিষদের এক সদস্য নাসের ভাই বর্তমান দেশ ও জাতিদ্রোহী সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের গুরুত্ব দিতে গিয়ে বলছিলেন, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি এতটাই শঙ্কিত যে, যদি এ সময় ইবলিসও এসে বলে, “আমিও বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একটা ঢিল ছুঁড়তে চাই, এদের কুকর্মের জন্য এদের মুখে থুথু মারতে চাই।” তাহলে আমি বলবো, বেশক। একটু মুচকি হেসে খান সাহেব বললেন, “নাসের আমার মনের কথাই বলেছে।”

ইতিহাসের উপর তাঁর দখল ছিলো দারুণ রকমের। ১৯৩৫ সালে যখন মুসলমানেরা ইংরেজ ও হিন্দুদের ডাবল গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ, সে সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন মুসলিম ছাত্রের ইতিহাসে গ্র্যাজুয়েশন পরীক্ষায় ডিস্টিংকশন পাওয়া মোটেই সহজ ব্যাপার ছিলো না। বিশেষ করে হিন্দুদের চরম সাম্প্রদায়িক মানসিকতার কারণে মুসলমান ছাত্রদের পক্ষে ভালো ফল করা খুবই কঠিন ছিলো। কারণ শিক্ষকদের প্রায় সকলেই ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক। তাঁর লিখিত ‘বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস’ ইতিহাসের প্রতি মরহুমের দখলের অন্যতম দলিল। এই বইটির প্রকাশনা উৎসবে সুসাহিত্যিক ও সকলের শ্রদ্ধেয় প-িত ব্যক্তি জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান বলেছিলেন, “আমার ধারণা ছিলো রাজনীতিবিদরা পড়াশুনা করেন না। কিন্তু খান সাহেবের বইখানা পড়ে মনে হয়েছে এমন কিছু রাজনীতিবিদ এখনো আছেন যারা শুধু পড়াশোনাই করেন না, মনে হয় বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আমরা যারা পড়াশুনা ও বিদ্যাবুদ্ধির অহঙ্কার করি তাদের চাইতে বেশী করেন। বরং শুধু পড়াশুনা নয়, গবেষকদের মতই লেখাপড়া করেন।” সত্যিই আমি নিজে সাক্ষী যে অসুস্থতার পূর্ব পর্যন্ত দিনের অধিকাংশ সময়ই জনাব আব্বাস আলী খান পড়াশুনায় কাটাতেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন বড় ধরনের আবেদ এবং মুত্তাকি। ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাত ছাড়াও নফলের প্রতি তিনি ছিলেন বেশ আগ্রহী। বিশেষ করে তাহাজ্জুদ নামাযে দীর্ঘ সময় কাটাতেন। দুয়েকবার তাঁর সাথে শেষ রাতে নামাযের সময় তাঁকে শিশুর মতো কাঁদতে দেখেছি। শুনেছি একা একা কুরআন পড়ার সময় তিনি অত্যন্ত আবেগভরে তেলাওয়াত করতেন। মাঝে মাঝেই তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠতো। অসুখে যখন বেহুঁশ অবস্থায় প্রায়ই জিজ্ঞেস করতেন ক’টা বাজে? উত্তর শুনার পর নামাযের সময় হলে তিনি যে ইশারায় নামায আদায় করছেন তা বুঝা যেতো। নাতি নাতনীদের প্রায় বলতেন, “ভালভাবে চলো। আল্লাহকে ভয় করো। আন্দোলনের কাজ করো। তাহলে জান্নাতে একসঙ্গে থাকতে পারবো। খালি আমার খেদমত করে লাভ হবে না।” চরম অসুস্থ অবস্থায় তাঁর স্নেহের এক নাতনীর উদ্দেশে থর থর করে কম্পমান হাতে লিখলেন, “তুই তো একটা পাগল, অথচ আমার সময় ফুরিয়ে গেছে, ইনশাআল্লাহ জান্নাতে দেখা হবে।”

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ